সোমবার, ২৭ মার্চ, ২০২৩

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে চাই কার্যকর উদ্যোগ


 

আমরা বিশ্ববাসী বর্তমানে একটি ভয়াবাহ যুদ্ধের ফলাফল ভোগ করছি। সেটি হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যা গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। রাশিয়ার ভাষায়, এটি বিশেষ সামরিক অভিযান আর ইউক্রেনের ভাষায় এটি রুশ আগ্রাসন। ঐ দিনে রাশিয়া বিশাল সামরিক বহর নিয়ে তার প্রতিবেশি দেশ ইউক্রেনে ঢুকে পড়ে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা শুরু করে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল, রাশিয়া কিছুদিনের মধ্যেই কিয়েভের পতন ঘটাবে। কিন্তু সময় গড়াতে ইউক্রেন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেনের পাশে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্ব। তাদের ব্যাপক সহযোগিতায় ইউক্রেন প্রতি আক্রমণ শুরু করেছে। এ কারণে এক বছর অতিক্রান্ত হলেও রাশিয়ার দৃশ্যত কোন সামরিক সফলতা অর্জিত হয় নি। স্নায়ু যুদ্ধকালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা গোষ্ঠি সমাজতান্ত্রিক বিশ্বকে ঠেকাতে ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল ন্যাটো গঠিত হয়। আবার সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে তৎকালীন পূর্ব ইউরোপের ৮টি সমাজতান্ত্রিক দেশ মিলে ১৯৫৫ সালে ১৪ মে ওয়ারশ প্যাক্ট গঠিত হয়। স্নায়ু যুদ্ধের অবসানে ওয়ারশ প্যাক্ট বিলুপ্ত হলেও ন্যাটো সক্রিয় থাকে। এমনকি ওয়ারশ প্যাক্টের দেশগুলো পর্যায়ক্রমে ন্যাটোর ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। এ প্রেক্ষিতে ইউক্রেনের পশ্চিমাপন্থী প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ইচ্ছা, তার দেশ ন্যাটোর সদস্য পদ গ্রহণ করবে। সঙ্গত কারণেই রাশিয়া তা মেনে নেবে না, এটিই স্বাভাবিক। কারণ রাশিয়া ইউক্রেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র, দুটিই এককালের সোভিয়েতভূক্ত রাজ্য। ইউক্রেনের ন্যাটোতে অর্ন্তভূক্তি ঘটলে রাশিয়ার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, এ আশঙ্কায় রাশিয়া এর তীব্র বিরোধিতা করে। তবে ন্যাটো ও ইউক্রেন তা সত্ত্বেও তাদের পরিকল্পনায় অগ্রসর হতে থাকে। তাই বাধ্য হয়ে রাশিয়া ইউক্রেনকে এ পথ থেকে সরাতে ও তাকে নিরস্ত্রীকরণ করতে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রাথমিক পর্যায়ে তুরস্ক এ যুদ্ধ বন্ধে তৎপরতা চালায়। একদিকে তুরস্ক যেমন ন্যাটোভূক্ত দেশ তেমনি রাশিয়ার সাথে রয়েছে তার ভাল সম্পর্ক। তবে তার সে প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয় নি। অতি সম্প্রতি চীন এ যুদ্ধ বন্ধে ১২ দফা শান্তি প্রস্তাব পেশ করে। রাশিয়া ও ইউক্রেন একে স্বাগত জানালেও যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রত্যাখান করে। এতে মনে হচ্ছে, রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন  সরাসরি যুদ্ধ না করলেও তারা ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। উভয় পক্ষ না চাইলে এ যুদ্ধ বন্ধ হবার নয়। পশ্চিমা গোষ্ঠি ইউক্রেনকে উস্কে দিয়ে এ যুদ্ধকে জিইয়ে রাখতে চায়। এ যুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত জয়-পরাজয় নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। হলেও তা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ইতোমধ্যে উভয়পক্ষের মধ্যে ব্যাপক হতাহত হয়েছে। তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অপরিমেয়। আর পরোক্ষভাবে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ আজ ক্ষতির সম্মুখীন। ইউক্রেনের এক কোটির অধিক মানুষ বাস্তুচ্যূত। রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করতে গিয়ে পশ্চিমা গোষ্ঠি একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়েই চলেছে। নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আপাতদৃষ্টিতে রাশিয়াকে কাবু করা যাচ্ছে না। তবে দীর্ঘমেয়াদী সেও ক্ষতির সম্মুখীন হবে এটি নিশ্চিত। যুদ্ধের কারণে খাদ্য ও জ্বালানী সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন, বিভিন্ন দেশে দূর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছে। কিছু দেশ দেউলিয়া হবার সীমানায় রয়েছে। অথচ কিছু দেশের যুদ্ধংদেহী মনোভাব এ যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছে। এতে করে আরো বেশি দেশ এর সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে। আর পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো যদি হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে এ অস্ত্রের প্রয়োগ ঘটায় তাহলে মানব সভ্যতা হুমকির মধ্যে পড়বে। সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর কোন হিরোসীমা, নাগাসাকি সৃষ্টি হোক, বিশ্ববাসী তা দেখতে চায় না। তাই যুদ্ধ নয়, আলোচনার টেবিলেই সকল সমস্যার সমাধান করতে হবে। যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সাধারণ নাগরিকরা কোনক্রমেই যুদ্ধ চায় না। অথচ তাদের সরকারগুলো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত জি-২০ দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. এন্টনী ব্লিংকেন এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. সের্গেই ল্যাভরভের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। এতে আশা করা হয়েছিল, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কোন অগ্রগতি হবে। সারা বিশ্বকে হতাশ করে জানা গেল, যুদ্ধ বন্ধে কোন সমঝোতা বা অগ্রগতি হয় নি। অর্থাৎ এ যুদ্ধ চলবে এক পক্ষ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত। যুদ্ধ বন্ধে বিবদমান পক্ষগুলো আন্তরিক না হলে, একগুঁয়েমী মনোভাব পরিত্যাগ না করলে এর পরিণতি ভয়াবাহ রূপ ধারণ করতে পারে। এই সুন্দর পৃথিবীকে আমরা ঝুঁকিতে ফেলতে চাই না। আমরা অবিলম্বে বিবদমান পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে এনে যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন